Home / ইলমুদ্দিন
ইলমুদ্দিন
ইলমুদ্দিন

ইলমুদ্দিন

গাজি ইলমুদ্দিন শহীদ 

ইলমুদ্দিন তৎকালীন অবিভক্ত ভারতবর্ষের সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে লাহোরে জন্মগ্রহণ করা একজন মুসলিম। ইলমুদ্দিন ৪ঠা ডিসেম্বর ১৯০৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন! তার পিতা একজন সাধারণ কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। তাই তারা খুব সাধারণ জীবন যাপন করতেন। তার পিতার নাম তালেমন্দ! তিনি ইলমুদ্দিনকে অনেক ভালোবাসতেন। ইলমুদ্দিনের জিবনি সংক্ষিত আকারে পড়তে চাইলে এই পোস্টটি পড়ুন। 

ইলমুদ্দিন এর শিক্ষা জীবন

সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়া সত্বেও তিনি ইলমুদ্দিনকে সঠিক শিক্ষায় মানুষ করার আপ্রান চেষ্টা করেছিলেন! তিনি ইলমুদ্দিনকে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের জন্য মসজিদে পাঠিয়ে ছিলেন। তৎকালীন শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশুদের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জনের জন্য মসজিদে পাঠানো হতো! স্বাভাবিকভাবেই তিনিও তার ছেলের কুরআন শিক্ষা ও প্রাথমিক জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে ছেলেকে মসজিদে পাঠিয়েছিলেন! ইলমুদ্দিন মসজিদে কিছুদিন যাতায়াত করে কিন্তু সে তার পাঠ সম্পন্ন করার পূর্বেই সেখান থেকে চলে আসে! অধিক জ্ঞান অর্জন তার পক্ষে আর সম্ভব হয়ে উঠেনি।

ইলমুদ্দিন এর পরিবার 

ইলমুদ্দিনের পিতা মধ্যবিত্ত হওয়ায় অধিক ধনলাভ ও প্রভাবশালী হওয়ার চিন্তা করতেন না! মধ্যবিত্ত জীবনের আশা আকাঙ্ক্ষাকে আঁকড়ে তিনি বাঁচতে চেয়েছেন! তাই উনার অন্য পুত্র মোহাম্মাদ উদ্দিন লেখাপড়া করেন লেখাপড়ায় মনোযোগী হওয়ার দরুন সরকারি চাকরি লাভ করেন! অন্যদিকে পড়াশোনা না করার কারণে বাবার দোকানে বাবার সাথে কাজে হাত লাগাই! সেই সূত্রে এর মদিনা কাঠমিস্ত্রি হওয়াকেই নিজের পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন! বাবা কে অনুসরণ করার মাধ্যমে সে নিজেও একজন ভালো কাঠমিস্ত্রি হয়ে যায়! এর মধ্যে বাবার কাছে এগিয়ে নিয়ে যায় অন্যদিকে মোহাম্মদ উদ্দিন সরকারি চাকরি করার মাধ্যমে পরিবারের হাল ধরেন।

ভাইয়ের সাথে ইলমুদ্দিন এর ভালোবাসার সম্পর্ক 

দুই ভাইয়ের মধ্যে খুবই বন্ধুসুলভ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের অফুরন্ত ভালোবাসা খুবই কম দেখতে পাওয়া যায়! একটি ঘটনার মাধ্যমে সেটি দেখা যেতে পারে। ইলমুদ্দিনকে প্রায়ই বাবার কাজে বিভিন্ন জায়গায় গমন করতে হতো! সেবার সে তার বাবার সাথে শিয়ালকোট গিয়েছে। মোহম্মাদ উদ্দিন এদিকে ইলমুদ্দিনকে নিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখে! দেখে যে ইলমুদ্দিন ব্যথা পেয়েছে। ভাইয়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসা থাকায় মুহাম্মাদ উদ্দিন আর থাকতে না পেরে শিয়ালকোট গিয়ে উপস্থিত হয়! মোহাম্মাদ উদ্দিন পৌঁছানোর পর দেখে ইলমুদ্দিন খাটে বসা ছিল। দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে! এবার সে ব্যস্ত হয়ে দেখতে থাকে তখন সে লক্ষ্য করে যে সত্যিই ইলমুদ্দিন হাতে ব্যথা পেয়েছে! ব্যথার জায়গাটা কাপড় দিয়ে বাঁধা। ইলমুদ্দিনের কাজের সময়টা তখন শুরুর দিকে থাকায় অসাবধানতায় লেগে গেয়েছিলো! মষ মুহাম্মদ উদ্দিন সেদিন শিয়ালকোট অবস্থান করে পরদিন ফিরে আসে । 

পারস্পারিক সম্পর্ক

ইলমুদ্দিন সেভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেনি কিন্তু পরিবার থেকে পারিবারিক শিক্ষা সংস্কৃতি সহনশীলতা সহমর্মিতা পারস্পরিক বন্ধন এসব শিক্ষা লাভ করেছিলেন। সৎ মানসিকতা নিয়ে বড় হয়েছিলেন । সত্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করার মতো মানসিকতা তিনি পরিবার থেকেই পেয়েছিলেন। মানুষের সাথে কিভাবে সুসম্পর্ক বজায় রাখা যায় সেই শিক্ষাও তিনি পরিবার থেকেই লাভ করেছিলেন। ইলমুদ্দিনের একজন প্রিয় বন্ধু ছিলেন তার নাম আব্দুল রশিদ। তাকে ‘শিদা’ বলে ডাকা হতো। শিদার সঙ্গেই ইলমুদ্দিন সকল মনের কথা খুলে বলতেন। তাদের দুজনের মধ্যে খুবই আন্তরিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল।

বই প্রকাশ

‘রঙ্গিলা রাসূল’ বইটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশে যে উত্তাল ঝড় ওঠে সেই বইটির প্রকাশক ছিলেন মহেষ রাজপাল। বইটি সঠিকভাবে কে লিখেছিলেন সেটা জানা যায়নি। তবে অনেক নাম শোনা যায় । এর মধ্যে যে নামটি সর্বজনস্বীকৃত সেটি হল কুমার প্রসাদ প্রীত। তবে তিনি বইটি ছদ্মনাম ব্যবহার করে লিখেছিলেন ।সেই ছদ্মনামটি ছিল পন্ডিত চামু পতি । বইটি ১৯২৩ সালে লাহোর থেকে রাজপাল কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছিল। এই বইটিতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর পবিত্র বৈবাহিক জীবন হাস্য রসাত্মক ভাবে উপস্থাপন করা হয়। রাসূলুল্লাহু (সাঃ)এর ১১ জন স্ত্রী  সম্পর্কে কটুক্তি মূলক কথা ব্যঙ্গ করে উপস্থাপন করা হয় ‘রঙ্গিলা রসুল’ বইটিতে।

রঙ্গিলা রাসূল প্রকাশের পটভূমি

১৯২০ সালের দিকে পাঞ্জাবের মুসলিম ও হিন্দু আর্য সমাজ একটি রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিল । সে সময় মুসলিমরা একটি প্যামফ্লেট প্রকাশ করে যেখানে রামের স্ত্রী সীতাকে শোচনীয় ভাবে উপস্থাপন করা হয়। বলা হয়ে থাকে এরই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আর্য সমাজের স্বামী দিয়ানন্দের এক অনুসারী কুমার প্রসাদ প্রীত পন্ডিত চিমুপতি লাল ছদ্মনামে রঙ্গিলা রাসূল বইটি লেখেন। 

এখানে যে হিন্দু সমাজের কথা বলা হচ্ছে তা ১০ এপ্রিল ১৮৭৫ সালে সনাতন হিন্দু ধর্ম থেকে উৎসারিত একটি নতুন শাখা । স্বামী দিয়ানন্দ সরস্বতী ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে আরিয়া সমাজ নামে এই নতুন শাখাটির প্রতিষ্ঠা করেন ।তিনি সনাতন হিন্দু ধর্মকে পরিমার্জন করে কিছু নিয়মকানুন সংযুক্ত করেন । যার মধ্যে মূর্তি পূজাকে অস্বীকার করা,দেবদেবীকে উপাস্য হিসেবে অস্বীকার করা, জাত পাত কে ধর্মীয় বিভাজন স্বীকার না করা অন্তর্ভুক্ত। এভাবে আরিয়া সমাজ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে খুব সহজেই শিক্ষিত সমাজে দৃষ্টি আকর্ষণ করে ।

স্বামী দিয়ানন্দ সরস্বতী সনাতন ধর্ম সংস্কার করার পাশাপাশি ইসলাম ধর্মকে নিজের অপরিপক্ক জ্ঞানের মাধ্যমে অবমাননা করা শুরু করে। স্বামী দিয়ানন্দ সরস্বতী ১৮৮৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন । মৃত্যুর পর তাঁর রচিত ‘সত্তিয়ারথ পোরকাশ’ প্রকাশ বই (সম্পূর্ণ কুরআন এর বিরুদ্ধে আপত্তি মূলককথায় ভরপুর) উর্দূতে অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়। আর এই বইটি উর্দূতে অনুবাদ করেন পন্ডিত চিমু পতি লাল । যিনি পরে রঙ্গিলা রাসূল বইটি লেখেন এবং যেটি রাজপাল নামক হিন্দু ব্যক্তি নিজের লাইব্রেরী থেকে প্রকাশ করে।

মুসলমানদের বিক্ষোভ

১৯২৩ সালে রঙ্গিলা রাসূল বইটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে পুরো হিন্দুস্থান জুড়ে যে বিক্ষোভের সৃষ্টি হয় তা মূলত বইয়ের প্রকাশক রাজপালকে শাস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে দিন দিন উত্তাল রূপ ধারণ করে । রঙ্গিলা রাসূল বইটির প্রকাশ মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিল। যখন রাজপাল এর বিরুদ্ধে মুসলমানদের আন্দোলন তুঙ্গে তখন ব্রিটিশ ইংরেজ সরকার নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল। হিন্দুদের এভাবে মুসলমানদের উস্কানিমূলক কাজের স্বীকৃতি যেন তারা চুপ থেকে দিচ্ছিলেন। কেননা যতবারই রাজপাল এর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মুসলিমরা আবেদন করেছিলেন ততোবারই তারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে ছিলেন। অথচ রাজপালকে নিরাপত্তা দেওয়ার মানসে ইংরেজ সরকার পুলিশ নিয়োগ করে।

এদিকে মুসলমানরা যেন কোন মতেই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে না পারে সেজন্য ১৪৪ ধারা জারি করে। আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী আলেম-উলামাদের প্রথমে শাস্তির ব্যবস্থা করে আন্দোলনকে দুর্বল করে দেওয়ার চেষ্টা করে ব্রিটিশ সরকার ।সরকারের এসব কার্যকলাপ দেখে মুসলিমরা আরো বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। নিজেদের ভেতরের আগুন তাদের পক্ষে আর দমিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি । ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মুসলিমরা দিল্লির অভ্যন্তরে শাহ মুহাম্মদ গোওস চত্বরে সমবেত হয় ।

শাহজি (রহঃ) এর বক্তৃতাঃ 

সমাবেশে অগ্নি দীপ্ত কণ্ঠে বক্তৃতা দেন শাহজি (রহঃ)। তিনি বলেন___

 আজ আপনারা সকলে মুহাম্মদ (সাঃ)এর সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়েছেন। মহামানব রাসূলুল্লাহ এর সম্মান, যেখানে উনার সম্মানে আল্লাহ তাআলার সমস্ত সৃষ্টিকুল সম্মানিত। আজ তার সম্মান মর্যাদা হুমকির সম্মুখে । রাসূলের স্ত্রী উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দিকা( রাঃ) উম্মুল মুমিনীন খাদিজাতুল কুবরা(রাঃ) হয়তো দরজায় দাড়ানো অবস্থায় বলছে, কুফফার গোষ্ঠীরা যে তোমাদের মা দেরকে অপমান করছে তা কি তোমরা দেখতে পাচ্ছো না ? শাহজি কথাটি এমন হৃদয়বিদারক কন্ঠে উপস্থাপন করেন যে সমাবেশের প্রত্যেকে দরজার দিকে ফিরে তাকায়। পুরো সমাবেশ থেকে আর্তনাদ ও আকুল কণ্ঠ ভেসে আসে।

শাহজি (রহঃ) আরো বলেন__

 রাসূলের প্রতি তোমাদের ভালবাসার এতই করুন অবস্থা যে তোমরা সাধারন পরিস্থিতিতে জীবন উৎসর্গ করে দাও অথচ রাসূলুল্লাহ এর সম্মান যে ধূলিসাৎ হচ্ছে তিনি যে কষ্ট পাচ্ছেন তার উপশম করা কি তোমাদের দায়িত্ব নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত একজন মুসলমান জীবিত আছে রাসূলের উপর হস্তক্ষেপকারী কোনমতে প্রশান্তি লাভ করতে পারে না। সরকার যেখানে নির্বাক প্রশাসন অথর্ব সেখানে মুসলিমরা চুপ করে বসে থেকে রাসূলের সম্মানহানি দেখতে পারেনা। 

এ সময় শাহজি (রহঃ) জোরালো কন্ঠে বলেন _

১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে এক সপ্তাহের মধ্যে যদি রাসূল (সাঃ)এর এই গুনাহগার কে কোন মুসলমান নওজোয়ান হত্যা করতে না পারে তাহলে রাসূলের কসম এই বৃদ্ধই নিজ হাতে এই মহান কাজ সম্পন্ন করবে। শাহজির এই অগ্নিদ্বীপ্ত কন্ঠের বক্তৃতা শুনে মুসলমানরা আরো বিক্ষোবে ফেটে পড়ে। তারা রাজপালকে নিজ হাতে শাস্তি দিতে ব্যাকুল হয়ে পড়ে। এভাবে শাস্তি দেওয়াকে তারা নিজেদের উপর অর্পিত দায়িত্ব বলে মনে করে।

খুনের প্রেক্ষাপট

ভারতবর্ষের মুসলিমরা যখন রাজপালকে হত্যা করাটা তাদের অন্যতম দায়িত্ব বলে মনে করছে! ঠিক সে সময় ইলমুদ্দিন নামের ১৯ বছর বয়সী এক যুবক তার বন্ধুদের সাথে লাহোরের ‘ওয়াজির খান‘ মসজিদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল! সে সময় মসজিদের মোল্লা সাহেব রাসূলকে অসম্মানকারী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তব্যের মাধ্যমে লোকজনকে একত্রিত করার চেষ্টা করছিলেন! ইলমুদ্দিন তৎক্ষণাৎ ঠিক করে নিয়েছিলেন তিনি এই কাজটি নিজ হাতে সুসম্পন্ন করবেন। ইতিমধ্যে সমগ্র ভারত বর্ষ আন্দোলনে মত্ত! সকলে একটি বিষয়ের উপর নিজেদের চিন্তা ধ্যান-ধারণাকে নিমজ্জিত রেখেছিলেন যে কি উপায়ে রাজপালকে শাস্তি দেওয়া যায়।

ইলমুদ্দিনকে খুনের চেষ্টার প্রারম্ভ হয় গাজী খোদাবকশ এর মাধ্যমে। 

লাহোরে বসবাসরত এক যুবক গাজী খোদাবকশ ইবনে মোহাম্মদ আকরাম, জানা যায় তিনি কাশ্মীরের অধিবাসী ছিলেন! তিনি ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯২৭ তারিখে নিজের জীবন বিপন্ন করে রাজপাল এর উপর আক্রমণ করেন। রাজপাল লাইব্রেরীতে নিজের কাজে ব্যস্ত ছিলেন! ঠিক সে সময়ে গাজী খোদাবকশ এসে ছুরি দিয়ে রাজপাল এর উপর আকস্মিক আক্রমন করেন! আকস্মিক এ আক্রমণে রাজপাল হন্তদন্ত হয়ে পালিয়ে গিয়ে আইন এর শরণাপন্ন হয়। পুলিশ গাজী খোদাবকশকে ৩০৭ ধারার অধীনে গ্রেপ্তার করে! লাহোরে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে মামলা শুনানি হয়। এ মামলায় গাজী খোদাবকশ নিজের পক্ষে কোন উকিল নিয়োজিত করতে অস্বীকৃতি জানান।

এদিকে রাজপালকে ঘটনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি বলেন, “আমার উপর আক্রমণ করা হয়েছে ‘রঙ্গিলা রাসূল’ বইটি প্রকাশ করার জন্যে। আমার মনে হয় খোদাবকশ আমাকে প্রাণে মেরে ফেলবে। কারণ খুনের সময় খোদাবকশ  চিৎকার করে বলছিল কাফিরের বাচ্চা আজ তোকে হাতের কাছে পেয়েছি আর জীবিত ছাড়বো না।

জজ সাহেব গাজী খোদাবকশ এর কাছে এর ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি একজন মুসলমান। রাসূলের সম্মান রক্ষা করা আমার উপর অর্পিত এক ফরজ দায়িত্ব। আমি কিছুতেই আমার রাসূলের অসম্মান মেনে নিতে পারি না। তাই (রাজপাল এর দিকে নির্দেশ করে) যে আমার প্রিয় রাসূলের সম্মান হস্তক্ষেপ করেছে তার ওপর আমি জীবন বাজি রেখে আক্রমণ করেছি। কিন্তু সে অল্পের জন্য আমার হাত থেকে বেঁচে গেছে। অপরাধের স্বীকারোক্তি শুনে আদালত গাজী খোদাবকশকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে।সাথে তিন মাস একাকী বাসের শাস্তিও রয়েছে। এবং নির্ধারিত সময়ের পরে নিরাপত্তা লাভের জন্য পাঁচ হাজার রুপি মূল্যের তিনটি জামানত দাখিল করার নির্দেশ দেয়া হয়। 

ইলমুদ্দিন ছাড়াও যারা রাজপালকে খুনের চেষ্টা করে। 

১৯ অক্টোবর ১৯২৭ আফগানিস্তানের কোহাট থেকে আগমন করেন এক ব্যবসায়ী যুবক যার নাম আব্দুল আজিজ! যেহেতু তিনি রাজপালকে চেনেন না তাই লাহোরে পৌঁছে তিনি রাজপালকে খুঁজতে খুঁজতে লাইব্রেরীর সামনে পৌঁছে যান! সেসময় রাজপাল লাইব্রেরীতে উপস্থিত ছিল না। তার পরবর্তীতে লাইব্রেরীতে বসা ছিল তার দুই বন্ধু জিতান্দর দাস ও স্বামী সত্যানন্দ! লাইব্রেরীতে বসে তারা ইসলামের বিরুদ্ধে আলোচনা করছিলেন। গাজী আব্দুল আজিজ আড়ালে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাদের আলোচনা শুনেন! এ আলোচনায় স্বামী সত্যানন্দ অগ্রণী ভূমিকা পালন করছিলেন। আব্দুল আজিজ স্বামী সত্যানন্দ কেই রাজপাল  মনে করেন। তরবারি কোষ মুক্ত করেই এক আঘাতেই স্বামী সত্যানন্দের জীবনের যবনিকাপাত রচনা করেন তিনি।

এরপর আব্দুল আজিজ নিজে চিৎকার করে বলতে থাকেন আমি রাসূলের অসম্মানকারীকে নিজ হাতে শাস্তি দিয়েছে আমার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হোক। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দুইবার অতর্কিত হামলা হওয়ায় রাজপাল ভীত স্বতন্ত্র হয়ে পড়ে। তাই সে আদালতের কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করে। ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট তার নিরাপত্তার জন্য দুইজন হিন্দু সিপাহি এবং একজন শিখ হাবিলদার নিয়োগ করে। রাজপাল এই নিরাপত্তা পেয়ে নিজের জীবনকে নিরাপদ বলে ভাবতে শুরু করে। কিছু মাস লাহোর থেকে দূরে সময় কাটিয়ে আসে। সে ভাবে এই সময়ের মধ্যে মুসলমানদের আন্দোলন শান্ত হয়ে যাবে সবকিছু নিস্তেজ হয়ে পড়বে এবং মুসলমানরা সবকিছু ভুলে যাবে। তখন সে পুনরায় লাহোরে ফিরে নিজের কাজ শুরু করে।

ইলমুদ্দিন রাজপালকে যেভাবে হত্যা করে

রাজপালের ধৃষ্টতা ইলমুদ্দিনের হৃদয়কে চরমভাবে নাড়া দেয়। রাজপালের নিকৃষ্ট ঐ সমস্ত কর্মকাণ্ড অবগত হওয়ায় তার মনে প্রবল ঝড় ওঠে! তার চিন্তা চেতনা মুহূর্তে বদলে যেতে থাকে। নবীর এই প্রকার অসম্মান সে কিছুতেই মন থেকে মানতে পারে না। ইলমুদ্দিন বাড়ি ফেরে কিন্তু তার মনে সেই একি বিষয় ঘুরপাক খেতে থাকে । তার বাবা তাকে এই অস্থিরতার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে সে সম্পূর্ন বিষয়ে খুলে বলে। সে রাজপালকে হত্যা করার নির্দেশ এর ব্যাপারেও বলে। তালেমন্দ খুব সাধারন পরিবারের ছিলেন এসব শুনে তিনিও একমত পোষণ করেন।রাজপাল এর মত অপরাধীকে জাহান্নামে পাঠানো উচিত বলে মনে করেন তালেমন্দ । তার বাবার এসব কথা শুনে ইলমুদ্দিন যেন স্বস্তি পায় মনে মনে যেন পরিবার থেকে অনুমতি পেয়ে গেছে এমনটা অনুভব করে সে।

ইলমুদ্দিন নির্ঘুম রাত কাটায় এসব ঘটনায় সে ছটফট করতে থাকে। তাই পরদিন তার বন্ধু শেদার  সাথে দেখা করে সমস্ত কিছু খুলে বলে। কেননা সে সময় পুরো হিন্দুস্থান জুড়ে শুধু এই একটিই আলোচনার বিষয় ছিল। সকলেই রাজপালের  এহেনো আস্পর্ধা  নিয়ে আলোচনায় মশগুল থাকতো সবসময়। ইলমুদ্দিন ও শেদাও নিজেদের মধ্যে  বুদ্ধি পরামর্শ করতে থাকে কিভাবে এর সুরাহা করা যায়। এসব চিন্তায় ইলমুদ্দিন প্রায় নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দেয়। পরিবারের লোকজন অবগত ছিল না বিধায় তারা বিষয়টি বুঝতে পারে না ইলমুদ্দিন কি করতে চলেছে।

ইলমুদ্দিনের এমন বেখেয়ালি পনা তার পিতা তালেমন্দকে দিনদিন ভাবিয়ে তোলে। তা ছাড়াও তিনি শেদার  সঙ্গে ইলমুদ্দিনের মেলামেশা বিশেষ পছন্দ করছিলেন না।কারণ তিনি কোন ভাবে জেনে গিয়েছিলেন শেদার বাবা জুয়া খেলে এবং শেদা নিজেও একজন বেখেয়ালি ছেলে। ইলমুদ্দিন হয়তো শেদার  সঙ্গ পেয়েইএমন বখে যাচ্ছে। তাই তিনি শেদার সাথে ইলমুদ্দিনের মেলামেশা আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন। 

ইলমুদ্দিনের সাথে পিতৃবিরোধ 

একদিন ইলমুদ্দিন দেরী করে বাড়ি ফেরে। তালেমন্দ রাগী স্বভাবের মানুষ ছিলেন । তিনিও নাছোড়বান্দা, ইলমুদ্দিন বাড়ি ফেরার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকেন। ইলমুদ্দিন বাড়ি ফিরতেই জিজ্ঞেস করেন কেন দেরি হয়েছে বাড়ি ফিরতে, নিষেধ করার পরেও শেদার সাথে কেন  মেলামেশা করছে, কেন ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছে না। এসমস্ত কথা নিয়ে ইলমুদ্দিনের সঙ্গে তালেমন্দের ঝামেলা লেগে যায়। একপর্যায়ে তিনি ইলমুদ্দিন কে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেন।মুহাম্মাদুদ্দিন সেসময় ঘরেই ছিল সে তার বাবাকে সামাল দেয় এবং নিজের ভাইকে অনেক করে বুঝিয়ে বলে যেন সে খারাপ সঙ্গ ত্যাগ করে। শেদার ব্যাপারে তার বড় ভাই ও বাবার এমন ধারণা দেখে খুবই ব্যথিত হয় ইলমুদ্দিন।

কিন্তু সে কাউকে কিছু বলে না কারণ সে তো  নিজের মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে নিয়েছিল ।যদিও সে কাফনের কাপড় অদৃশ্য ভাবে তার মাথায় বাধা ছিল। ইলমুদ্দিনের অবস্থার কোনো পরিবর্তন না দেখে তালেমন্দ তাকে বিবাহ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ইতিমধ্যে তিনি পাত্রীও ঠিক করে ফেলেন কারণ তিনি ভেবেছিলেন সংসার জীবনে প্রবেশ করলে ইলমুদ্দিন ঠিক হয়ে যাবে।

হঠাৎ এক রাতে ইলমুদ্দিন স্বপ্নে দেখে এক বুজুর্গ তাকে বলছে__ “ইলমুদ্দিন এখনো ঘুমিয়ে আছো। তোমার প্রিয় নবীর অসম্মান কি তোমার দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না।ওঠো, জলদি করে এর প্রতিকার করো।” তৎক্ষণাৎ তার ঘুম ভেঙে যায় ততক্ষণে সকাল হয়ে গিয়েছিল। তাই সে শেদার কাছে পৌঁছায় এবং এ স্বপ্নের বিষয় বলে। তখন শেদা জানায় সেও একই স্বপ্ন দেখেছে। তাই সেও নিজ হাতে এই কাজটি সম্পন্ন করতে চায়। যেহেতু বুজুর্গ দুজনকে এই আদেশ দিয়েছেন তাই তারা দুজনেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এখন কে তাহলে এই দায়িত্ব পালন করবে। দীর্ঘ সময় আলোচনার পরেও তারা কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেনা বিধায় নিজেদের মধ্যে লটারি করার সিদ্ধান্ত নেয়।

ইলমুদ্দিনের সৌভাগ্য

এবার লটারি তে প্রথমেই ইলমুদ্দিনের নাম ওঠে। শেদা পুনরায় অনুরোধ করে কিন্তু দ্বিতীয়বারেও ইলমুদ্দিনেরই নাম ওঠে! শেদা শেষবারের মতো আরো একবার অনুরোধ করে আরেকবার লটারি করার জন্য! কিন্তু শেষবারেও ইলমুদ্দিনের নাম ওঠে ফলে ইলমুদ্দিন নিশ্চিত হয়ে যায়! এবং মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে নেয় যে সে নিজেই এই গুরুদায়িত্ব নিজ হাতেই সম্পন্ন করবে! এর মধ্যে পুনরায় একই স্বপ্ন দেখে ইলমুদ্দিন। তাই সে আর দেরী না করে শেদার সাথে সাক্ষাৎ করে! শেষ স্মৃতিস্বরূপ একটি ছাতা ও ঘড়ি উপহার দেয় শেদাকে। রাতে ইলমুদ্দিনের ঘুম আসেনা ছটফট করে রাতটুকু কাটিয়ে দেয়।

পরদিন সকালে ৬ এপ্রিল ১৯২৯ তারিখে ইলমুদ্দিন ঘর থেকে বের হয়ে গুমটি বাজারে গিয়ে! আত্মারাম কামারের দোকানে থেকে এক রুপি মূল্যের একটি ছুরি কেনে! এবং যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করার মাধ্যমে ছুরি টিকে জামার ভেতরে লুকিয়ে ফেলে! কাঠমিস্ত্রি হওয়ার সুবাদে ছুরি-কাঁচির ব্যাপারে ভাল ধারনা ছিল ইলমুদ্দিনের! ছুরি কেনার পর থেকেই মনের মধ্যে এক অস্থিরতা অনুভব করতে থাকে ইলমুদ্দিন! এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। তৎক্ষণাৎ সে হাসপাতাল রোডে পৌঁছায়! আনারকলি হাসপাতাল রোডে ইশরত পাবলিশিং হাউজ এর সামনেই রাজপালের লাইব্রেরী ছিল! সেখানে পৌঁছে সে জানতে পারে রাজপাল এখনো আসেনি! রাজপালকে আদালত কর্তৃক যে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছিল সেই সিপাহীদের নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতর দিয়েই সে অফিসের সামনে পৌঁছে।

গাড়ি থেকে নামার সময় ইলমুদ্দিন রাজপালকে চিনতে পারে! রাজপাল যখন লাইব্রেরীতে  প্রবেশ করে, কুদারনাথ ও ভগতরাম নামে দুজন কর্মচারী উপস্থিত ছিল! কুদারনাথ বইপত্র গুছিয়ে রাখছিল এবং ভগতরাম রাজপালের পাশে এসে দাঁড়ায়। ইলমুদ্দিন তখন দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে! একজন যুবক দোকানে এসেছে তাই তারা বিশেষ সন্দেহ করেনি! কিন্তু ইলমুদ্দিন প্রবেশ করামাত্রই আর কালক্ষেপণ না করে জামার ভেতর থেকে ছুরি বের করে রাজপালের বুকে বিদ্ধ করে দেয়! ধারালো ছুরির আঘাতে রক্তেরধারা বইতে থাকে। ‘আহ’ শব্দ করার মাধ্যমেই রাজপাল মুখ থুবরে নিচে পড়ে যায়! এদিকে কর্মচারীরা চিৎকার করে বলতে থাকে তাদের মালিক কে খুন করার ব্যাপারে। ইলমুদ্দিন পালানোর কোনো চেষ্টা না করায়  পুলিশ এসে তাকে গ্রেফতার করে এবং মিয়ানওয়ালী কারাগারে পাঠিয়ে দেয়।

 গাজী ইলমুদ্দিনের মামলার রায়। 

ইলমুদ্দিন রাজপাল কে হত্যা করেছিলেন একজন গুনাহগার হিসেবে। নবীর প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নবী কে অসম্মান করার শাস্তি প্রদান করেছিলেন শুধুমাত্র। তাই তিনি নিজের পক্ষে কোন উকিল নিয়োজিত করেননি। কিন্তু ইসলামের প্রতি যে সম্মান দেখিয়ে ছিলেন ইলমুদ্দিন, সেই ঈমানী চেতনার দাবিতে অনেক মুসলমান আইনজীবী ইলমুদ্দিনের পাশে এসে দাঁড়ায়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যারিস্টার খাজা ফিরোজ উদ্দিন, ব্যারিস্টার ফারাখ হুসাইন এবং তাদের সহযোগিতায় ডা. এ আর খালেদ,মাস্টার সেলিম এবং আরো কয়েকজন এই মামলার পক্ষে লড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

১০ এপ্রিল ১৯২৯ তারিখে ইলমুদ্দিন কে প্রথম করে তোলা হয়। সাধারণত আদালতের কার্যক্রম ধীরগতি সম্পন্ন হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে আদালত খুব দ্রুত গতিসম্পন্ন কাজের নমুনা দেখিয়েছিল। গাজী খোদাবক্স ও আব্দুল আজিজ এর ক্ষেত্রে এক সপ্তাহের মধ্যেই রায় ঘোষণা করে দেয়া হয়। যদিও উকিলরা অসংখ্য দলিল ও আইন এর ধারা পেশ করার মাধ্যমে ইলমুদ্দিনের পক্ষে একনিষ্ঠ হয়ে সাহসিকতার সঙ্গে লড়ে যাচ্ছিলেন কিন্তু রায় সেতো পূর্ব নির্ধারিত ছিল।

৯ মে ১৯২৯ তারিখের ইলমুদ্দিনের ফাঁসির রায় ঘোষিত হয়।

ব্যারিস্টার ফারুক হুসাইন  মুম্বাই গিয়ে আইনজীবী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এর সাথে সাক্ষাত করেন। ইলমুদ্দিনের পক্ষে হাইকোর্টে আপিল করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সেসময় বোম্বেতে(বর্তমান ভারতের মুম্বাই) আইন প্র্যাকটিস করতেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ শুধু একজন আইনজীবী ছিলেন না তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা এবং জনপ্রতিনিধি ছিলেন। জিন্নাহ সেসময় কংগ্রেসের সাথে শুধু সমস্ত সম্পর্কই ছিন্ন করেনি বরং একইসাথে ১৯২৯ সালের ২৮ শে মার্চ তার “১৪ দফা” নিয়ে আসেন। এখানে একটি ধর্মসংক্রান্ত ইস্যু থাকার জন্যই তিনি লাহোরের এই মামলার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন।এরপর তিনি হাইকোর্টে ইলমুদ্দিনের জন্য আপিল করেন।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ আদালতে বলেন_ ইসলামের নবী রাসূলুল্লাহ (সাঃ)এর অসম্মান করা এবং জনসাধারণের মধ্যে ধর্মীয় দ্রোহের আগুন উস্কে দেয়া ১৩৫ ধারার আলোকে দণ্ডনীয় অপরাধ।কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রকাশক রাজপালের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আইনের এই নিস্তব্ধতাই ইলমুদ্দিনকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে অনুপ্রাণিত করেছে। তাই ইলমুদ্দিনের অপরাধকে ৩০২ ধারায় মার্ডার নির্দেশ না করে ৩০৮ ধারায় এজিটেশন কিলিং গণ্য করা উচিত। যার  শাস্তি সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ  পুরো ঘটনার জন্য উত্ত্যক্তকারীদের দায়ী করে যুক্তি উপস্থাপন করেন। ইলমুদ্দিন ১৯,২০ বছর বয়সী একজন যুবক যে কিনা তার বিশ্বাসের প্রতিষ্ঠার প্রতি ভালোবাসা থাকার কারণেই উত্তপ্ত হয়েছিলেন। তাছাড়া ইলমুদ্দিনের বয়স অনুযায়ী তাকে মৃত্যুদণ্ড আইন এর আওতাভুক্ত করা যায় না। তাই তার মৃত্যুদণ্ডকে যাবজ্জীবন অথবা দ্বীপান্তরে বদলানো যেতে পারে। কিন্তু হাইকোর্টের জাস্টিস শাদিলাল এসব তথ্যের কোন তোয়াক্কা না করে আপিল বাতিল করে দেন।

রঙ্গিলা রসূল ইলমুদ্দিনের ফাঁসির রায় কার্যকর।

৩১ অক্টোবর ১৯২৯ তারিখে উপমহাদেশে যে ফাঁসির আদেশ বাস্তবায়িত হয় তা এক কাঠমিস্ত্রির ১৯ বছর বয়সী অশিক্ষিত কৃষক ছেলের। এই ঘটনাটি আজ থেকে প্রায় ৯১ বছর পূর্বে ঘটেছিল। ফাঁসির আসামি পক্ষের সর্বশেষ আইনজীবী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ইলমুদ্দিন কে পরামর্শ দিয়েছিলেন, “তুমি একজন অল্প বয়সী যুবক, মহামান্য আদালত কে বলো এ কাজ করার সময় আমি মানসিক স্থিরতাসম্পন্ন ছিলাম না। কিন্তু ইলমুদ্দিন তা অস্বীকার করে। কিন্তু ইলমুদ্দিন এর ফাঁসি ও পূর্বাপর এবং পরবর্তী ঘটনা ছিল উপমহাদেশে সবচেয়ে আলোচিত ও বিক্ষোভ ময় ঘটনা। এমনকি এই ঘটনা প্রবাহ হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের অবনতি, ব্রিটিশবিরোধী অগ্রগণ্যতা এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অগ্রগামিতা এনে দেওয়ায় অন্যতম অনুঘটকের কাজ করে। ইলমুদ্দিনের ফাঁসির পূর্বে তার শেষ ইচ্ছা জানতে চাইলে সে দুই রাকাত নামাজ পড়ার সুযোগ চেয়েছিল। ১৯২৯ সালের ৩১শে অক্টোবর শহীদ ইলমুদ্দিনের ফাঁসি কার্যকর করার পর তাকে মিয়ানওয়ালিতে কবর দেয়া হয়।

ইলমুদ্দিনের জানাজা ও দাফন। 

মুসলমানরা শহীদ ইলমুদ্দিনকে লাহোরে কবর দিতে চেয়েছিলেন যেখানে কিনা তাকে মিয়ানওয়ালীতে জানাজার নামাজ ছাড়াই দাফন করা হয়েছিলো। এ নিয়ে মুসলিমরা প্রচন্ড বিক্ষোবে ফেটে পড়ে। ইলমুদ্দিনের শাহাদাতের খবর সমগ্র উপমহাদেশে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে। শহীদ ইলমুদ্দিনের লাশ ওসিয়ত মোতাবেক দাফন করার দাবিতে তুমুল আন্দোলন শুরু হয়। মুসলমানরা আল্লামা ইকবালের নেতৃত্বে বরকত মোহামেডান হলে  সমাবেশ ঘোষণা করে। ১লা নভেম্বর আল্লামা ইকবালের বাড়িতে মিটিং সংঘটিত হয়। আল্লামা ইকবালের নেতৃত্বে মুসলিম লীগের কাউন্সিলে ফিরিঙ্গি সরকারের থেকে শহীদের লাশ আদায়ের ব্যাপারে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হয়। ব্রিটিশ সরকার এতে ভীত হয়ে পড়েন কারণ এভাবে চলতে থাকলে আন্দোলনকে দমানো মুশকিল হয়ে যাবে। যেখানে নবীর সম্মান রক্ষার জন্য ইলমুদ্দিনের সম্মানিত হওয়ার কথা সেখানে তাকে শহীদ হতে হয়েছে। মুসলিমরা তার ফাঁসিতেই ব্রিটিশ সরকারের উপর ক্ষুব্ধ ছিল এখন যখন তাদের চাওয়া সত্ত্বেও ইলমুদ্দিনকে লাহোরে কবর না দিয়ে মিয়ানওয়ালী তে দেয়া হচ্ছে তখন তারা ব্রিটিশ সরকারের প্রতি কি মনোভাব পোষণ করতে পারে তা বুঝতে আর বাকি ছিল না ব্রিটিশ সরকারের।

৫ই নভেম্বর আল্লামা ইকবাল, স্যার মুহাম্মদ শফি, মিয়া আব্দুল আজিজ, মাওলানা গোলাম মুহিউদ্দিন প্রমুখ নেতৃবৃন্দ গভর্নরের সাথে সাক্ষাৎ করেন! সকল মুসলমানদের পক্ষ থেকে শহীদের লাশ সমর্পণের জন্য আবেদন করেন। এরূপ অবস্থায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা হওয়া অপরিহার্য বিষয়। তাই এরূপ পরিস্থিতিকে সামাল দিতে ব্রিটিশ সরকার ইলমুদ্দিনের লাসকে পুনরায় কবর থেকে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আল্লামা ইকবাল এবং মিয়া আবদুল আজিজের নিশ্চিতকরণের পরই তার দেহ ১৪ দিন পর ১৯২৯ সালের ১৪ই নভেম্বর কবর থেকে তোলা হয়। তারপর ট্রেনে করে দুই দিন পর লাশ লাহোরে পৌঁছে। সমস্ত শহর ও আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ জানাজায় অংশগ্রহণ করে। কেননা ইলমুদ্দিনের বীরত্বের কথা প্রায় সমগ্র উপমহাদেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল।

ইলমুদ্দিনের জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি। 

লাহোরের ভাটিচক থেকে শুরু করে সুমনাবাদ পর্যন্ত পুরো এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়! জানা যায়, জানাজার নামাজে প্রায় ছয় লক্ষাধিক মানুষ অংশ নিয়েছিল! আল্লামা ইকবাল কে জানাজার নামাজ পড়াতে বলা হলে তিনি বলেন,”আমি একজন পাপী ব্যক্তি‌, ইসলামের এই বীরের জানাজার নামাজের ইমাম হওয়ার যোগ্যতা আমার নেই‌! পরবর্তীতে ওয়াজির খান মসজিদের ইমাম ও মোহাম্মদ শামসুদ্দীন জানাজার নামাজের নের্তৃত্ব প্রদান করেন! ইলমুদ্দিনের প্রতি সকল মুসলিমদের এই সম্মান সত্যিই অপ্রতুল ছিল! কবি এবং সাংবাদিক মাওলানা জাফর ইকবাল আলী সেখানে বলেন, “যদি আমি এরকম এক আশীর্বাদপুষ্ট সম্মান অর্জন করতে পারতাম”! আল্লামা ইকবাল লাশ বহন করে নিয়ে যান। যখন তিনি লাশটিকে তার কবরে রাখতে যাচ্ছিলেন তখন তিনি বলেন,”এ অশিক্ষিত তরুণটি আমাদের মত শিক্ষিতদের কে ছাড়িয়ে গেছে। লাহোরের ভাওয়ালপুর রোডের নিকটস্থ মিয়ান সাহেবের কবর স্থানে সকলে ইলমুদ্দিনের প্রশংসা করার মাধ্যমে মর্যাদার সাথে তার লাশের দাফন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে।

আল্লামা ইকবালের কৃতিত্ব। 

মাওলানা যফর আলী খান চিৎকার করে  বলে ওঠেন “হায়! “আজ এই মর্যাদা যদি আমার নসিবে জোটতো”। ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লামা ইকবালের মুখ থেকে উচ্চারিত হয়! আমরা পরিকল্পনাই বানাতে থাকি আর এক কাঠমিস্ত্রির ছেলে এসে মর্যাদা লুফে নিয়ে যায়! গাজী ইলমুদ্দিন নবীর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনে বিজয়ী প্রার্থী হয়ে গেল! অথচ যাদের কাছ থেকে এই কাজ আশা করা যেত তারা পরিকল্পনায় করতে থাকলো! এই ঘটনার পরের বছর আল্লামা ইকবাল “পাকিস্তান রাষ্ট্রতত্ত্ব”দেন।

এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পৃথক আবাসভূমির দাবি চূড়ান্ত হতে থাকে! জীবিত ইলমুদ্দিনের চেয়ে শহীদ ইলমুদ্দিন রাজনীতিতে এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের অন্যতম প্রভাবশালী সত্বা! পাকিস্তানের পেনাল কোডের সেকশন ২৯৫ তৈরি হয় তার ঘটনা সামনে রেখে! ১৯৮২ তে সেকশন ২৯৫ বি, ১৯৮৫ তে সেকশন ২৯৫ সি পাকিস্তান পেনাল কোডে অন্তর্ভুক্তি কালে ইলমুদ্দিনের কথা ভূমিকায় উঠে আসে!  সেসব ধারায় কোরআন অবমাননা, আল্লাহর রাসূলের অবমাননা প্রভৃতি বিষয় উঠে আসে এবং সেসব বিষয়ে গুরুদন্ডের উল্লেখ করা হয়।

গাজী ইলমুদ্দিনকে যে সমস্তা মর্যাদা দেওয়া হয়। 

সমগ্র উপমহাদেশে ইলমুদ্দিনের বীরত্বের ইতিহাস এতই দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল যে প্রায় ছয় লক্ষাধিক মানুষ তার জানাজায় অংশ নিয়েছিল! এমন কী আশ্চর্যজনক যে বিষয়টি ঘটেছিল! তা হলো ১৪ দিন পরে লাশ উত্তোলন করা হলে দেখা যায় ইলমুদ্দিনের দেহ না পচন ধরে ছিল, না দুর্গন্ধ ছিল, না তার কাপড়ে কোন পরিবর্তন ঘটেছিল।

 ইলমুদ্দিনকে প্রথমে গাজী(বীর) উপাধি দেওয়া হয়। এবং মৃত্যুর পর শহীদ উপাধিতে ভূষিত করা হয়! পাকিস্তান জুড়ে বিভিন্ন স্থাপনা, পার্ক এমনকি রাস্তার নামকরণ করা হয় তার নামে। হাসপাতাল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয় তাথ নামে! লাহোরে ইলমুদ্দিনের নামে একটি মাজার গড়ে ওঠে। ইলমুদ্দিনের মাজার জিয়ারত লাহোর জুড়ে এখনো অন্যতম আকর্ষণ। আল্লামা ইকবাল সহ অসংখ্য কবি ইলমুদ্দিন কে নিয়ে কবিতা লেখেন এবং তাকে নিয়ে অনেক পুস্তকও লেখা হয়। ইলমুদ্দিনের জীবন উৎসর্গ বৃথা যায়নি। তার আত্মত্যাগের মহিমায় সকল আলেম-উলামা যারা নবীর সম্মান বাঁচাতে উদ্বিগ্ন ছিলেন তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ হয়ে যায়। তাদের আশীর্বাদ চিরকালের জন্য কাজ ইলমুদ্দিন শহীদের উপর পুষ্পের ন্যায় বর্ষিত হতে থাকে। হিন্দু মুসলিমদের যে দাঙ্গা অবশ্যম্ভাবী ছিল তা ইলমুদ্দিনের সমাপ্তির সাথে নিথর হয়ে যায়। সকল মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সম্মান প্রাপ্ত করে সে। গাজী ইলমুদ্দিনকে এখনো মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

আমাদের ওয়েবসাইটটিতে আসলে ইসলামিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখা হয়ে থাকে। দেখে আসুন আমাদের ilmuddin – ইলমুদ্দিন মুল ওয়েবসাইটটি।