Home / অন্যান্য / ইলমুদ্দিন
ইলমুদ্দিন
ইলমুদ্দিন

ইলমুদ্দিন

ইলমুদ্দিনের ছেলেবেলাঃ ইলমুদ্দিন তৎকালীন অবিভক্ত ভারতবর্ষের সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করা একজন মুসলিম। ইলমুদ্দিন ৪ঠা ডিসেম্বর ১৯০৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন! ইলমুদ্দিন এর পিতার নাম তালেমন্দ। তিনি পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। তিনি ইলমুদ্দিনকে অনেক ভালোবাসতেন! তিনি ইলমুদ্দিনকে কোরআন ও প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের জন্য মসজিদে পাঠিয়েছিলেন! কিন্তু ইলমুদ্দিন তার শিক্ষা সম্পন্ন করার পূর্বেই ফেরত চলে আসে! এবং পরবর্তীতে পিতার মতোই কাঠমিস্ত্রি হওয়াকে নিজের পেশা হিসেবে গ্রহণ করে! ইলমুদ্দিনের সহোদর ভাই মুহাম্মাদুদ্দিন পড়াশোনায় ভালো হওয়ায় সরকারি চাকুরি লাভ করে। তাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মধুর সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল! ইলমুদ্দিনের প্রাণপ্রিয় একজন বন্ধু ছিলেন যার নাম আব্দুল শেদা। তাকে শিদা বলে ডাকা হতো! ইলমমুদ্দিন ও শেদার মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল অটুট।

বই প্রকাশ ও আন্দোলন

১৯২৩ সালে ‘রঙ্গিলা রাসুল’ বই প্রকাশের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশে যে উত্তাল ঝড় ওঠে সে বইটির প্রকাশক ছিলেন মহেষ রাজপাল! বইটি সঠিকভাবে কে লিখেছিলেন সেটা জানা যায়নি। তবে অনেকের নাম শোনা যায়! এরমধ্যে যে নামটি সর্বজনস্বীকৃত সেটি হল কুমার প্রসাদ প্রীত। তবে তিনি বইটি ছদ্মনাম ব্যবহার করে লিখেছিলেন! সেই ছদ্মনামটি ছিল পন্ডিত চামু পতি লাল।এই বইটিতে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর পবিত্র বৈবাহিক জীবন হাস্য রসাত্মক ভাবে উপস্থাপন করা হয়! রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ১১ জন স্ত্রী সম্পর্কে কটুক্তি মূলক কথা ব্যঙ্গ করে উপস্থাপন করা হয় রঙ্গিলা রসুল বইটিতে।

যা মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিল! ১৯২৩ সালে ‘রঙ্গিলা রাসুল’‌ বইটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে পুরো হিন্দুস্থান জুড়ে যে বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়! তা মূলত বইয়ের প্রকাশক রাজপালকে শাস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে দিন দিন উত্তাল রুপ ধারণ করে! যখন রাজপাল এর বিরুদ্ধে মুসলমানদের আন্দোলন তুঙ্গে তখন বৃটিশ সরকার নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিলো।

ইলমুদ্দিন কর্তৃক রাজপালের হত্যা

ভারতবর্ষের মুসলিমরা যখন রাজপালকে হত্যা করা তাদের অন্যতম দায়িত্ব বলে মনে করছে! ঠিক সেইসময় ইলমুদ্দিন নামে ১৯ বছর বয়সী এক যুবক তার বন্ধুদের সাথে লাহোরের ‘ওয়াজির খান’  মসজিদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল! এ সময় মসজিদের মোল্লা সাহেব রাসূলকে অসম্মানকারীদের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তব্যের মাধ্যমে লোকজনকে একত্রিত করার চেষ্টা করছিলেন! এসব শুনে ইলমুদ্দিন তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নেয় সেই নিজ হাতে শাস্তি দেবে এই নরাধম রাজ্যপাল কে।

ইলমুদ্দিন লাহোরের উর্দু বাজারে গিয়ে একটি চাকু ক্রয় করেন। সেই চাকুটি নিজের জামার ভেতরে গোপন রেখে সাথে করে নিয়ে যায়। ইলমুদ্দিন এর আগে কখনো রাজপালকে দেখেনি তাই লাইব্রেরির সামনে পৌঁছানোর পর লোকদের কাছে রাজপাল সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতে থাকে। এভাবে রাজপালকে খুঁজে পেয়ে যায় ইলমুদ্দিন। সেসময় রাজপাল লাইব্রেরীতে বসে ছিলেন।তাই আর কালবিলম্ব না করে জামার ভেতর থেকে ছুরি বের করে রাজপালকে আক্রমণ করে। ছুরিকাঘাতে রাজপালের ভবলীলা সাঙ্গ করেন ইলমুদ্দিন। রাজপালকে হত্যার পর ইলমুদ্দিন আর পালানোর কোন চেষ্টাই করেনি। ফলশ্রুতিতে পুলিশ ইলমুদ্দিনকে গ্রেফতার করে এবং মিয়ানওয়ালী কারাগারে পাঠিয়ে দেয়।

কোর্ট কার্যক্রম ও রায় ঘোষণা

১০‌ এপ্রিল ১৯২৯ তারিখে ইলমুদ্দিন কে প্রথম কোর্টে তোলা হয়।সাধারণত আদালতের কার্যক্রম ধীরগতি সম্পন্ন হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আদালত দ্রুতগতিসম্পন্ন কাজের নমুনা দেখিয়েছিল। ইলমুদ্দিন রাজপাল কে হত্যা করেছিলেন একজন গুনাহগার হিসেবে। নবীর প্রেম উদ্বুদ্ধ হয়ে নবীকে অসম্মান করার শাস্তি প্রদান করেছিলেন শুধুমাত্র। তাই তিনি নিজের পক্ষে কোন উকিল নিয়োজিত করেননি। কিন্তু ইসলামের প্রতি যে সম্মান দেখেছিলেন ইলমুদ্দিন, সেই ঈমানী চেতনার দাবিতে অনেক মুসলমান আইনজীবী ইলমুদ্দিনের পাশে এসে দাঁড়ায়।তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যারিস্টার খাজা ফিরোজ উদ্দিন এবং তাদের সহযোগিতায় ডাক্তার এ আর খালেদ এবং আরো কয়েকজন এই মামলার পক্ষে লড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ব্যারিস্টার ফারুক হুসাইন মুম্বাই গিয়ে আইনজীবী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ইলমুদ্দিনের পক্ষে আপিল করার জন্য।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ইলমুদ্দিনকে পরামর্শ দিয়েছিলেন “তুমি একজন অল্প বয়সী যুবক, মহামান্য আদালত কে বলো এ কাজ করার সময় আমি মানসিক স্থিরতা সম্পন্ন ছিলাম না।” কিন্তু ইলমুদ্দিন তা অস্বিকার করে। পরবর্তীতে ৩১শে অক্টোবর ১৯২৯ তারিখে উপমহাদেশে এক কাঠমিস্ত্রির ১৯ বছর বয়সী অশিক্ষিত কৃষক ছেলের ফাঁসি রায় ঘোষিত হয়।

জানাযা ও দাফন

মুসলমানরা শহীদ  ইলমুদ্দিনকে লাহোরে কবর দিতে চেয়েছিলেন যেখানে কিনা তাকে মিয়ানওয়ালী তে জানাজার নামাজ ছাড়াই দাফন করা হয়েছিল। এ নিয়ে মুসলিমরা প্রচন্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ইলমুদ্দিনের শাহাদাতের খবর সমগ্র উপমহাদেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। শহীদের লাশ দাফন করার দাবিতে তুমুল আন্দোলন শুরু হয়। মুসলিমদের এই আন্দোলনের তোপের মুখে টিকতে না পেরে ব্রিটিশ সরকার ভীত হয়ে পড়েন।কারণ এভাবে চলতে থাকলে আন্দোলনকে দমানো মুশকিল হয়ে যাবে।পরিস্থিতিকে সামাল দিতে ব্রিটিশ সরকার ইলমুদ্দিনের লাশকে পুনরায় কবর থেকে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১৯২৯ সালের ১৪ই নভেম্বর, ১৪ দিন পরে ইলমুদ্দিনের লাশ কবর থেকে তোলা হয়। তারপর ট্রেনে করে দুই দিন পর লাশ লাহোরে পৌঁছে।সমস্ত শহর ও আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ জানাজায় অংশগ্রহণ করে। লাহোরের ভাটিচক থেকে শুরু করে সুমনাবাদ পর্যন্ত পুরো এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়।

জানা যায়,জানাজার নামাজে প্রায় ৬ লক্ষাধিক মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। ‘ওয়াজিদ খান’ মসজিদের ইমাম ও মোহাম্মদ শামসুদ্দীন জানাজার নামাজের নেতৃত্ব প্রদান করেন। লাহোরের ভাওয়ালপুর রোডের নিকটস্থ মিয়ান সাহেবের কবরস্থানে সকলে ইলমুদ্দিন এর প্রশংসা করার মাধ্যমে মর্যাদার সাথে সুষ্ঠু ভাবে তার দাফন কার্য সম্পন্ন করে,সকলে তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।

ইলমুদ্দিনের সম্পর্কে আরও বিস্তারিত পড়তে বা এই ইতিহাস সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে এই পোস্টটি পড়ে আসতে পারেন। রঙ্গিলা রসূল গাজী ইলমুদ্দিন শহীদের সম্পূর্ণ জিবন বৃত্তান্ত বিস্তারিত। 

রান্না সম্পর্কিত বিভিন্ন রেসিপি পেতে এই rannarecipes.com ওয়েবসাইটটি ভিজিট করুন। 

Check Also

রাগ পরিমাপ করুন

সাইকোলজির সাহয্যে আপনার রাগ পরিমাপ করুন

সাইকোলজি টেস্ট!! আপনার রাগের মাত্রা কতটুকু ? আজকে আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চলেছি একটি নতুন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *